বেকারত্ব দূরীকরণ ও তরুণদের কারিগরি দক্ষতায় রূপান্তর: জাতীয়তাবাদী ভিশন ও কর্মসংস্থানের রোডম্যাপ

ts ayub blog

ইঞ্জিনিয়ার টি এস আইয়ূব (কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য, বিএনপি)

পঠন সময়: ৪-৫ মিনিট

একটি দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি ও অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি হলো তার যুবসমাজ। বাংলাদেশ বর্তমানে ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ বা জনসংখ্যার বয়সভিত্তিক সোনালী সময় পার করছে, যেখানে আমাদের মোট জনসংখ্যার একটি বিরাট অংশই তরুণ। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, সঠিক দিকনির্দেশনা, মানসম্মত শিক্ষা এবং রাজনৈতিক দূরদর্শিতার অভাবে এই বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী আজ বেকারত্বের অভিশাপ ও হতাশায় নিমজ্জিত।

কেবলমাত্র গতানুগতিক সাধারণ ডিগ্রিনির্ভর পড়ালেখা করে হাজার হাজার যুবক চাকরির বাজারের পেছনে দৌড়াচ্ছেন, অথচ দেশি-বিদেশি আধুনিক শিল্পখাতগুলোতে দক্ষ জনবলের তীব্র অভাব দেখা যাচ্ছে।

জাতীয়তাবাদী রাজনীতি এবং পেশাগত প্রকৌশলবিদ্যার জায়গা থেকে আমি স্পষ্ট বিশ্বাস করি—তরুণদের হাতকে কেবল ভোটারের হাত নয়, বরং দক্ষ কর্মীর হাত হিসেবে গড়ে তোলাই হলো স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার প্রধান শর্ত। আমাদের তরুণদের দরকার সার্টিফিকেটসর্বস্ব পড়াশোনার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানের কারিগরি শিক্ষা ও প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থানের সুযোগ।

১. আইটি ও ফ্রিল্যান্সিং হাব: দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের তরুণদের নতুন দিগন্ত

যশোরের ‘শেখ হাসিনা সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক’সহ স্থানীয় অবকাঠামোগুলোকে সঠিক রাজনৈতিক সদিচ্ছার মাধ্যমে তরুণদের প্রকৃত কর্মসংস্থান কেন্দ্রে রূপান্তর করতে হবে।

  • উপজেলা পর্যায়ে ফ্রি হাই-স্পিড আইটি ট্রেনিং সেন্টার: বাঘারপাড়া ও যশোরের প্রতিটি উপজেলায় তরুণ-তরুণীদের বিনামূল্যে গ্রাফিক্স ডিজাইন, ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, ডিজিটাল মার্কেটিং ও সফটওয়্যার কোডিং শেখার আন্তর্জাতিক মানের ডিজিটাল হাব গড়ে তোলা হবে।
  • ফ্রিল্যান্সারদের ব্যাঙ্কিং ও পে-আউট জটিলতা নিরসন: ফ্রিল্যান্সাররা যেন তাদের অর্জিত রেমিট্যান্স অতি সহজে ও কোনো হিডেন চার্জ ছাড়াই দেশে আনতে পারেন, তার জন্য জাতীয়তাবাদী পলিসির আওতায় ব্যাঙ্কিং সুবিধা সহজীকরণ করা হবে।

২. এগ্রো-টেক (Agro-Tech) ও ভোকেশনাল স্কিল ডেভেলপমেন্ট

আমাদের যশোর ও বাঘারপাড়া অঞ্চল কৃষিতে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। চিরাচরিত কৃষির সাথে আধুনিক প্রযুক্তির মেলবন্ধন ঘটিয়ে তরুণদের ‘কৃষি উদ্যোক্তা’ হিসেবে গড়ে তোলার অপার সম্ভাবনা রয়েছে।

  • আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির প্রশিক্ষণ: ড্রোন প্রযুক্তি, হাইড্রোপনিক্স, অটোমেটেড গ্রিনহাউস এবং প্রসেসিং প্ল্যান্ট পরিচালনার জন্য স্থানীয় তরুণদের বিশেষ টেকনিক্যাল কোর্স প্রদান।
  • জামানতমুক্ত ‘এগ্রো-লোন’ ও স্টার্টআপ ফান্ড: যেকোনো কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন যুবক যেন নিজস্ব ডেইরি, পোল্ট্রি, মৎস্য বা ড্রেস মেকিং কারখানা গড়ে তুলতে পারেন, তার জন্য রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত সহজ শর্তে প্রারম্ভিক মূলধন বা ক্যাপিটাল ফান্ডিংয়ের ব্যবস্থা করা।

৩. ভোকেশনাল ও টেকনিক্যাল শিক্ষার সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি

আমাদের সমাজে ডিপ্লোমা বা কারিগরি শিক্ষার চেয়ে সাধারণ শিক্ষাকে বেশি প্রাধান্য দেওয়ার একটি ভুল মানসিকতা গড়ে উঠেছে। এই দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করা জরুরি।

  • শিল্পখাতের চাহিদা অনুযায়ী পাঠ্যক্রম: কারিগরি ইনস্টিটিউটগুলোর সিলেবাসকে দেশের টেক্সটাইল, সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং, ইলেকট্রনিক্স ও অটোমোবাইল ইন্ডাস্ট্রির বর্তমান চাহিদার সাথে রি-ডিজাইন করা হবে।
  • আন্তর্জাতিক সার্টিফাইড ট্রেনিং: তরুণদের এমনভাবে প্রশিক্ষিত করা হবে যেন তারা কেবল দেশেই নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বাজারে সাধারণ শ্রমিকের পরিবর্তে ‘হাইলি স্কিল্ড টেকনিশিয়ান’ হিসেবে উচ্চ বেতনে কাজের সুযোগ পান।

৪. মাদক ও হতাশা দূরীকরণে ‘স্পোর্টস অ্যান্ড লার্নিং’ ইকোসিস্টেম

কর্মসংস্থানের অভাব ও হতাশা তরুণ সমাজকে মাদকের দিকে ঠেলে দেয়। একটি মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে তরুণদের কাজের পাশাপাশি বিনোদন ও খেলাধুলার সুযোগ দিতে হবে।

  • কাজের সুযোগ ও দক্ষতা: যখন একজন তরুণের হাতে নির্দিষ্ট স্কিল থাকবে এবং সে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবে, তখন সমাজে অপরাধ ও মাদকের প্রবণতা এমনিতেই শূন্যে নেমে আসবে।
  • যুব সমাজ কল্যাণ ফান্ড: স্থানীয় তরুণদের বিভিন্ন খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক আয়োজন এবং উদ্ভাবনী আইডিয়া বাস্তবায়নে বিশেষ অনুদান ও পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করা।

উপসংহার

হতাশা নয়, আত্মবিশ্বাস নিয়ে আমাদের তরুণরা মাথা তুলে দাঁড়াবে—এটিই আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গীকার। দেশের সুউচ্চ ফ্লাইওভার বা বিল্ডিং তৈরির চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো আমাদের তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা।

এসো তরুণ, হাত মেলাও আধুনিক প্রযুক্তির সাথে; আমরা একজোটে গড়ে তুলব এক স্বনির্ভর, উন্নত ও দক্ষ বাংলাদেশ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top