সুশাসন ও টেকসই অবকাঠামো: রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ

A serene mustard field with lush palm trees under a clear sky.

লেখক: ইঞ্জিনিয়ার টি এস আইয়ূব (কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য, বিএনপি)

পঠন সময়: ৪-৫ মিনিট

একটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সামর্থ্য ও নাগরিক জীবনযাত্রার মান পরিমাপের অন্যতম প্রধান মাপকাঠি হলো তার ভৌত অবকাঠামো (Physical Infrastructure)। রাস্তাঘাট, সেতু, কালভার্ট, বাঁধ এবং মেঘা প্রজেক্টগুলো কেবল কংক্রিট আর স্টিলের কাঠামো নয়; এগুলো একটি দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখার মূল ধমনী।

কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমরা দেখেছি, পরিকল্পনা থেকে শুরু করে বাস্তবায়ন—প্রতিটি ধাপে সঠিক প্রফেশনাল তদারকি ও রাজনৈতিক সুশাসনের অভাবে অবকাঠামো খাত দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ে কাজ শেষ না হওয়া, বারবার বাজেট বৃদ্ধি এবং নিম্নমানের মেটেরিয়াল ব্যবহারের কারণে নির্মাণের কয়েক বছরের মধ্যেই সেতুতে ফাটল ধরা বা রাস্তা ধসে যাওয়ার মতো ঘটনা নিত্যদিনের চিত্রে পরিণত হয়েছে।

জাতীয়তাবাদী রাজনীতি এবং পেশাগত প্রকৌশলবিদ্যার জায়গা থেকে আমি স্পষ্ট বিশ্বাস করি—স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং টেকসই পরিকল্পনাই হলো ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের উন্নয়নের মূল ভিত্তি।

১. মেগা প্রজেক্ট ও সাধারণ বাজেট: স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ

উন্নয়নমূলক প্রকল্পগুলোর সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয় প্রাক্কলিত ব্যয় (Estimated Cost) এবং সময়সীমা নিয়ে। জনগণের ট্যাক্সের টাকার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা যেকোনো রাজনৈতিক নেতৃত্বের নৈতিক দায়িত্ব।

  • উন্মুক্ত টেন্ডারিং ও সিন্ডিকেট নির্মূল: ঠিকাদারি ও টেন্ডার প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের দলীয় প্রভাব বা সিন্ডিকেট বরদাশত করা হবে না। যোগ্য ও অভিজ্ঞ প্রফেশনাল ফার্মগুলো যেন নিরপেক্ষভাবে কাজ পায়, তা সুনিশ্চিত করা হবে।
  • স্বাধীন টেকনিক্যাল অডিট: প্রতিটি বড় প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি ও খরচের হিসাব তদারকি করতে স্বাধীন প্রকৌশলী ও হিসাবরক্ষক দলের মাধ্যমে নিয়মিত ‘টেকনিক্যাল ও ফাইন্যান্সিয়াল অডিট’ পরিচালনা করা জরুরি।

২. সঠিক মেটেরিয়াল ও স্ট্রাকচারাল কোয়ালিটি কন্ট্রোল

একটি স্থাপনা কত বছর টিকবে, তা নির্ভর করে তার স্ট্রাকচারাল ডিজাইন ও নির্মাণসামগ্রীর মানের ওপর। প্রকৌশলগত সততা বাদ দিয়ে টেকসই অবকাঠামো নির্মাণ অসম্ভব।

  • ল্যাব টেস্ট বাধ্যতামূলক করা: রড, সিমেন্ট, ইট, বালু এবং কনক্রিটের সহনশীলতা পরীক্ষা (Testing) ছাড়া কোনো ঢালাই বা নির্মাণ অনুমোদন পাবে না।
  • কোড মানা (BNBC Compliance): বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (BNBC) শতভাগ মেনে সরকারি ও বেসরকারি সব ধরনের স্থাপনা ডিজাইন ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা হবে, যেন যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে স্থাপনাগুলো সুরক্ষিত থাকে।

৩. দূরদর্শী নগর ও গ্রামীণ মাস্টারপ্ল্যান

পরিকল্পনাহীন উন্নয়ন কখনোই সুফল আনে না। শহরের পাশাপাশি গ্রামীণ অবকাঠামোকেও পরিকল্পিত মাস্টারপ্ল্যানের আওতায় আনতে হবে।

  • জলাবদ্ধতামুক্ত ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক: রাস্তা নির্মাণের সময় ড্রেনেজ বা পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না রাখলে সেই রাস্তা কয়েক মাসেই নষ্ট হয়ে যায়। তাই প্রতিটি সড়ক প্রজেক্টের সাথে প্রফেশনাল ড্রেনেজ ডিজাইন একীভূত করা হবে।
  • আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষা: শুধু রাজধানী বা বড় শহরকেন্দ্রিক উন্নয়ন নয়; বাঘারপাড়া-যশোরসহ প্রতিটি উপজেলা ও গ্রামীণ অঞ্চলে আধুনিক মানসম্মত যোগাযোগ নেটওয়ার্ক ছড়িয়ে দেওয়া হবে।

৪. রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনিক ব্যবস্থা

একটি দুর্নীতিমুক্ত অবকাঠামো খাত গঠনে রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তিই হলো মূল চালিকাশক্তি।

  • জিরো টলারেন্স নীতি: ঠিকাদার, কর্মকর্তা বা রাজনৈতিক ব্যক্তি—যেই হোক না কেন, নকশা পরিবর্তন বা নিম্নমানের কাজ করে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করলে দৃষ্টান্তমূলক আইনি শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে।
  • জনগণের কাছে তথ্য প্রকাশ (Public Transparency): কোন প্রকল্পের ব্যয় কত, কাজ শেষ হওয়ার নির্ধারিত সময় কবে এবং কে বাস্তবায়ন করছে—তা সর্বসাধারণের জানার জন্য প্রজেক্ট সাইটে সাইনবোর্ড ও ডিজিটাল পোর্টালে উন্মুক্ত রাখা হবে।

উপসংহার

উন্নয়ন কেবল ক্ষমতার প্রচারণার হাতিয়ার হতে পারে না; উন্নয়ন হতে হবে টেকসই, নিরাপদ এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য উপযোগী। পেশাগত অভিজ্ঞতা ও জাতীয়তাবাদী আদর্শকে কাজে লাগিয়ে আমরা এমন এক বাংলাদেশ গড়তে চাই, যেখানে প্রতিটি ইটে থাকবে সততা আর প্রতিটি প্রকল্পে থাকবে জনকল্যাণের প্রতিফলন।

আসুন, দুর্নীতি ও অপচয় রোধ করে একটি নতুন ও সুশাসিত বাংলাদেশ গঠনে একাত্ম হই।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top