লেখক: ইঞ্জিনিয়ার টি এস আইয়ূব কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য, বিএনপি
সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী কৃষক দল |
পঠন সময়: ৪-৫ মিনিট
“চিকিৎসা মানুষের মৌলিক অধিকার”—সংবিধানের এই কথাটি আজও আমাদের দেশের কোটি কোটি প্রান্তিক মানুষের কাছে কেবলই কাগজের কলমে সীমাবদ্ধ। গ্রাম বা মফস্বল অঞ্চলের কোনো সাধারণ মানুষ অসুস্থ হলে প্রথম চিন্তা ডায়াগনস্টিক ফি, ওষুধের দাম আর দূর-দূরান্তের হাসপাতালে পৌঁছানোর খরচ।
আমাদের দেশের সাধারণ পরিবারগুলো কোনো বড় ব্যাধিতে আক্রান্ত হলে স্রেফ চিকিৎসার খরচ চালাতে গিয়ে সর্বশান্ত হয়ে পড়ে। পর্যাপ্ত বাজেট allocation-এর অভাব, ওষুধ ও চিকিৎসার দুর্নীতি, এবং জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে ভঙ্গুর করে তুলেছে।
জাতীয়তাবাদী রাজনীতি এবং পেশাগত অভিজ্ঞতার জায়গা থেকে আমি বিশ্বাস করি—একটি আধুনিক রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব তার প্রতিটি নাগরিকের প্রাথমিক চিকিৎসা ও জীবন রক্ষা নিশ্চিত করা। ইট-পাথরের ফ্লাইওভার বা মেগা প্রজেক্টের চেয়েও একজন প্রান্তিক মানুষের সঠিক চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা অনেক বেশি জরুরি।
১. উপজেলা ও ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোর অবকাঠামোগত সংস্কার
যশোর ও বাঘারপাড়াসহ দেশের প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং ইউনিয়ন কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোকে স্রেফ ‘নামমাত্র প্রতিষ্ঠান’ না রেখে পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্য সেবাকেন্দ্রে রূপান্তর করতে হবে।
- প্রফেশনাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার আধুনিকায়ন: সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং প্ল্যানিংয়ের মাধ্যমে হাসপাতালগুলোর পরিচ্ছন্নতা, পর্যাপ্ত বেড ব্যবস্থা, ইমার্জেন্সি রুম এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ (সৌরশক্তি নির্ভর) নিশ্চিত করা।
- ডাক্তার ও নার্সদের উপস্থিতি নিশ্চিতকরণ: মফস্বল পর্যায়ের হাসপাতালে ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করতে আধুনিক বায়োমেট্রিক ও ডিজিটাল তদারকি ব্যবস্থা চালু করা।
২. ওষুধ ও জরুরি প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষার সহজলভ্যতা
চিকিৎসার ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের পকেটের বড় অংশই খরচ হয় ওষুধ কেনা এবং প্রাইভেট ডায়াগনস্টিক সেন্টারের চড়া মূল্যের টেস্টে।
- বিনামূল্যে জীবন রক্ষাকারী ওষুধ সরবরাহ: সরকারি হাসপাতালে প্রয়োজনীয় প্রাথমিক ও জটিল রোগের জেন্যারিক ওষুধ বরাদ্দ বাড়িয়ে তা সরাসরি রোগীদের হাতে পৌঁছানোর নিশ্চিতকরণ।
- সস্তায় উন্নত ল্যাব টেস্ট: উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে আধুনিক এক্স-রে, ইসিজি, আল্ট্রাসনোগ্রাফি ও ব্লাড টেস্টের যন্ত্র বাধ্যতামূলক করা, যেন দরিদ্র মানুষদের প্রাইভেট ক্লিনিকে গিয়ে জিম্মি হতে না হয়।
৩. জাতীয়তাবাদী ‘সর্বজনীন স্বাস্থ্য বীমা’ (Universal Health Coverage)
আমুল পরিবর্তনের জন্য আমাদের চিরাচরিত স্বাস্থ্য ব্যবস্থার নীতিগত রূপান্তর প্রয়োজন।
- দরিদ্র পরিবারের জন্য হেলথ কার্ড: নিম্নবিত্ত ও প্রান্তিক পরিবারের জন্য বিশেষ জাতীয়তাবাদী ‘হেলথ কার্ড’ চালু করা, যার মাধ্যমে নির্দিষ্ট জটিল রোগে (যেমন: ক্যান্সার, কিডনি রোগ, হৃদরোগ) সরকারি অনুদান বা ফ্রিতে জরুরি চিকিৎসা মিলবে।
- জরুরি অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস: গ্রামীণ প্রত্যন্ত এলাকা থেকে মুমূর্ষু রোগীকে অতি দ্রুত জেলা বা বিভাগীয় হাসপাতালে পৌঁছানোর জন্য জিপিএস-ট্র্যাকড সরকারি অ্যাম্বুলেন্স নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা।
৪. দুর্নীতিমুক্ত স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা ও নাগরিক তদারকি
স্বাস্থ্য খাতের কেনাকাটা ও টেন্ডার প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি বন্ধ করা আমাদের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক অঙ্গীকার।
- জিরো টলারেন্স নীতি: ওষুধ কেনাকাটা ও চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহে যেকোনো প্রকার অনিয়ম বা ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হবে।
- নাগরিক তদারকি কমিটি: প্রতিটি স্থানীয় হাসপাতালে সুশীল সমাজ, সাংবাদিক এবং জনগণের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে তদারকি কমিটি রাখা হবে, যারা সরাসরি সেবার মান পর্যবেক্ষণ করবেন।
উপসংহার
স্বাস্থ্যসেবা কোনো বিশেষ শ্রেণীর সুযোগ নয়, এটি প্রতিটা নাগরিকের অধিকার। একটি সুস্থ ও সবল জাতিই পারে এক সমৃদ্ধ ও স্বাবলম্বী বাংলাদেশ নির্মাণ করতে।
যশোর তথা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রতিটি মানুষ যেন হাতের কাছে উন্নত ও দুর্নীতিমুক্ত চিকিৎসা পায়, সেই লক্ষ্য অর্জনে আমরা বদ্ধপরিকর।



