বাংলাদেশের ইতিহাসে আমরা এখন এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি। দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রাম, আত্মত্যাগ এবং রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের পর দেশ এক নতুন দিনের আলো দেখেছে। এই পরিবর্তন শুধু ক্ষমতার হাতবদল নয়; এটি মানুষের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, বৈষম্যের অবসান এবং রাষ্ট্রকে একটি সুস্থ, স্বাভাবিক কাঠামোর মধ্যে ফিরিয়ে আনার সম্মিলিত গণআকাঙ্ক্ষা।
তবে ইতিহাসের এই মোড়ে দাঁড়িয়ে আমাদের সবচেয়ে বড় সতর্কতা প্রয়োজন—বিজয় যেন প্রতিশোধের রূপ না নেয়।
অতীতের অন্যায়, মামলা-হামলা, জুলুম ও নিপীড়নের জবাব যদি একই কায়দায় প্রতিহিংসা দিয়ে দেওয়া হয়, তবে নতুন বাংলাদেশ গঠনের স্বপ্ন মুখ থুবড়ে পড়বে। একজন রাজনৈতিক কর্মী এবং পেশাগত প্রকৌশলী হিসেবে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি: ধ্বংস করার জন্য কোনো দক্ষতার প্রয়োজন হয় না, কিন্তু নতুন করে কিছু গড়তে প্রয়োজন সততা, মেধা, বিজ্ঞানসম্মত পরিকল্পনা ও পেশাদারিত্বের একনিষ্ঠ চর্চা।
প্রতিহিংসার সংস্কৃতি বনাম আইনের শাসন
রাজনীতিতে গত কয়েক দশকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করেছে প্রতিশোধের রাজনীতি। এক দল আরেক দলকে নিশ্চিহ্ন করার যে অপচেষ্টা চালিয়েছে, তাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশের বিচারব্যবস্থা, প্রশাসন এবং অর্থনীতি।
- আইনের চোখে সবাই সমান: অন্যায়ের বিচার হবে আদালতের মাধ্যমে, কোনো ব্যক্তি বা দলের খেয়ালখুশি কিংবা মব জাস্টিসের মাধ্যমে নয়।
- রাজনৈতিক পরমতসহিষ্ণুতা: ভিন্নমতকে শত্রু না ভেবে যৌক্তিক সমালোচনার জায়গা দিতে হবে। শক্তিশালী বিরোধী কণ্ঠই একটি সুস্থ গণতন্ত্রের রক্ষাকবচ।
- প্রতিশোধমুক্ত প্রশাসন: সরকারি দপ্তরগুলোতে পদোন্নতি ও পদায়ন হতে হবে মেধার ভিত্তিতে, দলীয় পরিচয়ে নয়।
রাষ্ট্র পরিচালনায় ‘মেধা ও পেশাদারিত্বের’ বিকল্প নেই
একটি দেশকে টেকসইভাবে এগিয়ে নিতে হলে নীতি নির্ধারণের প্রতিটি ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট খাতের দক্ষ পেশাজীবীদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
- ইনফ্রাস্ট্রাকচার ও মেগা প্রজেক্টের অডিট: বিগত বছরগুলোতে মেগা প্রজেক্টের নামে যে হরিলুট হয়েছে, তা থামাতে প্রতিটি উন্নয়ন প্রকল্পের কারিগরি ও অর্থনৈতিক মূল্যায়ন প্রফেশনাল প্রকৌশলী ও অর্থনীতিবিদদের দিয়ে করানো।
- দুর্নীতিমুক্ত টেন্ডার ও জবাবদিহিতা: রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে কাজ বাগিয়ে নেওয়ার সংস্কৃতি পুরোপুরি বন্ধ করে শতভাগ স্বচ্ছ ই-টেন্ডারিং এবং প্রকল্পের মান তদারকি নিশ্চিত করা।
- যোগ্যতার মূল্যায়ন: দলীয় ক্যাডার রাজনীতির বদলে দেশের সবচেয়ে মেধাবী তরুণ, গবেষক ও পেশাজীবীদের রাষ্ট্রীয় পলিসি তৈরিতে যুক্ত করা।
যশোর ও বাঘারপাড়ায় আধুনিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির অঙ্গীকার
স্থানীয় পর্যায় থেকে এই রূপান্তরের সূচনা হতে হবে। যশোর ও বাঘারপাড়ার সাধারণ মানুষ দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার অপব্যবহার, চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্বের শিকার হয়েছে।
- দখলবাজি ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স: কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যদি দলের নাম ভাঙিয়ে চাঁদাবাজি বা সন্ত্রাসে জড়ায়, তবে তাকে এক মুহূর্তের জন্যও প্রশ্রয় দেওয়া হবে না।
- নাগরিক সেবা সহজীকরণ: ভূমি অফিস, থানা বা স্থানীয় হাসপাতালে কোনো নাগরিককে যেন দলীয় সুপারিশের জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরতে না হয়; নাগরিক অধিকার নিশ্চিত হবে কোনো মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াই।
- ঐক্যের প্ল্যাটফর্ম: দল-মত নির্বিশেষে এলাকার উন্নয়ন, শান্তি ও শৃঙ্খলার স্বার্থে সব পক্ষের প্রতিনিধিদের নিয়ে ঐক্যবদ্ধ সমাজ গঠন।
তরুণ প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষা ধারণ করা
আমাদের তরুণরা রক্ত দিয়ে প্রমাণ করেছে তারা ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে কতটা আপসহীন। তাদের এই ত্যাগের মর্যাদা দিতে হলে পুরনো ধ্যান-ধারণার রাজনীতি ছুড়ে ফেলতে হবে।
- স্বচ্ছতা ও সত্যনিষ্ঠতা: তরুণরা ফাঁকা বুলি বা নাটকীয় স্লোগান চায় না; তারা চায় কাজের হিসাব এবং সৎ নেতৃত্ব।
- কর্মসংস্থান ও মেধার সুযোগ: মামা-ভাগ্নে কিংবা ঘুষের সংস্কৃতি ভেঙে ফেলে প্রতিটি ক্ষেত্রে মেধার সর্বোচ্চ মূল্যায়ন করা হবে।
একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক এবং অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী বাংলাদেশ গড়ার সুযোগ আমাদের সামনে এসেছে। এই সুযোগ যদি আমরা নষ্ট করি, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না।
আসুন, আমরা ক্রোধের আগুন নিভিয়ে নির্মাণ ও সংস্কারের হাত বাড়িয়ে দিই। মেধা, সততা ও আধুনিক বিজ্ঞানের আলোয় এক নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণ করি।



