দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রাণ হলো এর নদ-নদী। একসময় কপোতাক্ষ, ভৈরব, বেতনা আর চিত্রা নদীকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল যশোর, বাঘারপাড়া ও আশপাশের অঞ্চলের সমৃদ্ধ কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও মানববসতি। কিন্তু অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ, রাজনৈতিক আশ্রয়ে অবৈধ দখলদারি এবং নিয়মিত ড্রেজিং না করার কারণে আজ এই নদীগুলো মরে যাচ্ছে।
ফলস্বরূপ প্রতি বর্ষা মৌসুমে যশোর ও বাঘারপাড়ার বিস্তীর্ণ এলাকা মাসের পর মাস স্থায়ী জলাবদ্ধতায় নিমজ্জিত থাকে। হাজার হাজার হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়, মাছের ঘের ভেসে যায় এবং সাধারণ মানুষকে মানবেতর জীবনযাপন করতে হয়।
একজন প্রফেশনাল প্রকৌশলী এবং জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে আমি স্পষ্ট বিশ্বাস করি—টাকা খরচের নামে লোকদেখানো খনন নয়, বরং বিজ্ঞানসম্মত হাইড্রোলজিক্যাল প্ল্যানিং এবং কঠোর রাজনৈতিক সদিচ্ছাই পারে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলকে জলাবদ্ধতার অভিশাপ থেকে চিরতরে মুক্ত করতে।
১. কপোতাক্ষ ও ভৈরব সংকটের মূল প্রকৌশলগত কারণ
জলাবদ্ধতা কেন দূর হচ্ছে না, তা বুঝতে হলে বাস্তব সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা জরুরি:
- উজানে মিষ্টি পানির প্রবাহ হ্রাস: উজানের নদীগুলোর সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় পলি জমার হার মাত্রাতিরিক্ত বেড়েছে।
- জোয়ার-ভাটার প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট: অপরিকল্পিত স্লুইস গেট ও পোল্ডার নির্মাণের ফলে জোয়ারের সাথে আসা পলি নদীগর্ভে আটকা পড়ে নদী ভরাট করে দিচ্ছে।
- রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে দখলদারি ও ঘের তৈরি: খাল ও শাখা নদীগুলোতে অবৈধ বাঁধ ও জাল দিয়ে মাছ চাষের নামে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
- অপরিকল্পিত সড়ক ও ব্রিজ নির্মাণ: কালভার্ট ও ব্রিজের স্প্যান নদী বা খালের প্রস্থের তুলনায় ছোট করায় পানি নিষ্কাশনে স্থায়ী বাধা তৈরি হচ্ছে।
২. টেকসই জলাবদ্ধতা নিরসনে ইঞ্জিনিয়ারিং রূপরেখা
সাময়িক সমাধান নয়, আমাদের প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী এবং টেকনিক্যাল ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট:
- টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট (TRM) বাস্তবায়ন: কপোতাক্ষ অববাহিকায় পলি ব্যবস্থাপনার জন্য স্থানীয় জনস্বার্থ রক্ষা করে সমন্বিত টিআরএম পদ্ধতি কার্যকর করা। এতে জমি পলিযুক্ত হয়ে উঁচু হবে এবং নদীর নাব্য স্বাভাবিক থাকবে।
- ক্যাপিটাল ড্রেজিং ও চ্যানেল সোজা করা: নদীর গুরুত্বপূর্ণ বাঁক ও ভরাট অংশগুলোতে ড্রেজিং করে সঠিক ক্রস-সেকশন ফিরিয়ে আনা, যেন বর্ষায় অতিরিক্ত পানি দ্রুত সাগরে নামতে পারে।
- খাল পুনঃখনন ও নেটওয়ার্ক ইন্টার-কানেক্টিভিটি: বাঘারপাড়া ও যশোরের প্রতিটি সংযোগ খাল এবং বিলের পানি নিষ্কাশন চ্যানেলকে নদীর মূল ধারার সাথে আধুনিক লেভেল সার্ভে অনুযায়ী পুনঃসংযুক্ত করা।
৩. দখলদারদের বিরুদ্ধে আপসহীন রাজনৈতিক অবস্থান
প্রকৌশলগত পরিকল্পনা কখনোই সফল হবে না যদি দখলদারদের হাত থেকে নদী রক্ষা না করা যায়।
- দখলবাজদের কোনো দলীয় পরিচয় নেই: নদী, খাল বা সরকারি জলাশয় দখলকারী ব্যক্তি যে দলেরই হোক না কেন, তার বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হবে।
- অবৈধ বাঁধ ও ঘের উচ্ছেদ: অবিলম্বে নদী ও খালের স্বাভাবিক গতিপথ আটকে তৈরি করা সমস্ত বাঁধ অপসারণ করে পানি চলাচলের পূর্ণ স্বাধীনতা ফিরিয়ে দিতে হবে।
- নদী রক্ষা মনিটরিং সেল: স্থানীয় কৃষক, সচেতন নাগরিক এবং কারিগরি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে স্থানীয় পর্যবেক্ষণ কমিটি গঠন করা হবে, যারা নদী দখলের যেকোনো অপচেষ্টা সরাসরি প্রতিহত করবে।
৪. কৃষি ও পরিবেশের ভারসাম্য পুনরুদ্ধার
জলাবদ্ধতা দূর হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতিতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে।
- ফসলি জমির সুরক্ষা: কৃষকরা সময়মতো বোরো ও আমন ধান আবাদ করতে পারবেন এবং জলাবদ্ধতার কারণে বছরে দুই ফসলের ক্ষতি থেকে রক্ষা পাবেন।
- ভূগর্ভস্থ পানির স্তর রক্ষা: নদীর নাব্য ফিরলে মিষ্টি পানির মজুদ বাড়বে, যা মাটির লবণাক্ততা কমিয়ে কৃষিকে টেকসই করবে।
নদী বাঁচলে বাঁচবে আমাদের যশোর, বাঁচবে বাঘারপাড়া, বাঁচবে দেশ। নদী কোনো একক ব্যক্তির স্বার্থের জন্য নয়; এটি প্রকৃতি ও প্রতিটি নাগরিকের অভিন্ন সম্পদ। বিজ্ঞান, সততা এবং সুদৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকারের সমন্বয়ে আমরা আমাদের নদ-নদীগুলোকে পূর্বের প্রবাহে ফিরিয়ে আনব।
আসুন, নদী ও পরিবেশ বাঁচাতে দল-মত নির্বিশেষে আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ হই।
💬 আপনার মতামত ও অভিজ্ঞতা জানান:
আপনার এলাকায় কোন খাল বা নদীর নাব্যতা হারানোর কারণে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে? এর সমাধানে আপনার কোনো পরামর্শ থাকলে নিচে কমেন্টে লিখুন।
🔗 যুক্ত থাকুন: https://www.facebook.com/Engr.TSAyubBNP



