ইঞ্জিনিয়ার টি এস আইয়ুব | কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য, বিএনপি |
সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী কৃষক দল |
একটি সমাজের আসল সভ্যতা ও মানবিকতার পরিচয় মেলে সে সমাজ তার প্রবীণ, অবহেলিত ও অসহায় মানুষদের কীভাবে মূল্যায়ন করে তা দেখে। যে বয়স্ক মানুষগুলো সারাজীবন নিজের রক্ত-ঘাম ঝরিয়ে সমাজ, পরিবার ও দেশকে সেবা দিয়ে গেছেন, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তাঁরাই অনেক সময় অবহেলা, একাকীত্ব ও আর্থিক অনটনের মুখোমুখি হন।
একইভাবে আমাদের সমাজের প্রতিবন্ধী ও বিধবা নারীরা আজও যথাযথ রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক সুরক্ষার অভাবে মানবেতর জীবনযাপন করেন। ভাতা বিতরণে রাজনৈতিক স্বজনপ্রীতি, প্রশাসনিক জটিলতা এবং অপর্যাপ্ত সামাজিক বাজেটের কারণে মূল সাহায্য পাওয়ার যোগ্য ব্যক্তিরা প্রায়ই বঞ্চিত থেকে যান।
জাতীয়তাবাদী রাজনীতি ও সমাজকল্যাণমূলক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি—প্রবীণ ও বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন নাগরিকদের সুযোগ-সুবিধা কোনো রাষ্ট্রীয় দয়া নয়, এটি তাঁদের মৌলিক অধিকার।
১. ভাতা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও দুর্নীতিমুক্ত বিতরণ
বর্তমান বাজারে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির তুলনায় প্রবীণ, বিধবা ও প্রতিবন্ধী ভাতার পরিমাণ একেবারেই অপ্রতুল।
- ভাতার পরিমাণ বৃদ্ধি ও বাস্তবমুখীকরণ: সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ভাতার পরিমাণ বাড়িয়ে বর্তমান বাজারমূল্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার রাজনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া।
- সরাসরি ডিজিটাল অর্থ পাঠাল (Direct Cash Transfer): মধ্যস্বত্বভোগী বা স্থানীয় প্রভাবশালীদের দুর্নীতি বন্ধে ডিজিটাল ব্যাঙ্কিং ও মোবাইল ফাইন্যান্সের মাধ্যমে সরাসরি প্রকৃত সুবিধাভোগীর হাতে টাকা পৌঁছানো নিশ্চিত করা।
- দলীয় প্রভাবমুক্ত তালিকা তৈরি: ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে প্রকৃত অসহায় মানুষদের নিয়ে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ ডাটাবেজ তৈরি করা।
২. ‘প্রবীণ স্বাস্থ্য সেবা’ ও বিনামূল্যে চিকিৎসা সহায়তা
বয়সের সাথে সাথে নানা ব্যাধি প্রবীণদের প্রধান সঙ্গী হয়ে দাঁড়ায়। চিকিৎসার খরচ চালাতে গিয়ে অনেক অসহায় পরিবার আরও নিঃস্ব হয়ে পড়ে।
- উপজেলা হাসপাতালে ‘সিনিয়র সিটিজেন কর্নার’: সরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রবীণ নাগরিকদের জন্য আলাদা কাউন্টার, দ্রুততম সময়ে ডাক্তার দেখানো ও ফ্রি প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষার সুব্যবস্থা করা।
- ফ্রি মেডিসিন ও হেলথ ক্যাম্প: যশোর ও বাঘারপাড়ার প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে প্রতি মাসে প্রবীণ ও প্রতিবন্ধীদের জন্য ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প ও প্রয়োজনীয় নিয়মিত ওষুধ বিতরণ করা।
৩. প্রবীণদের সম্মান ও সামাজিক মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠা
কেবল আর্থিক সাহায্য নয়, প্রবীণদের মানসিক বিকাশ ও সামাজিক সম্মান ফিরিয়ে আনা আমাদের অন্যতম দায়িত্ব।
- প্রবীণ বিনোদন ও কল্যাণ কেন্দ্র: প্রতিটি উপজেলায় এমন একটি স্থান গড়ে তোলা যেখানে প্রবীণরা একসাথে বসে সময় কাটাতে, পত্রিকা পড়তে ও একে অপরের সাথে অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে পারেন।
- প্রবীণ পরামর্শক কমিটি: স্থানীয় উন্নয়ন মূলক কাজের নীতি নির্ধারণে অভিজ্ঞ প্রবীণ শিক্ষক, সরকারি চাকুরিজীবী ও মুরব্বিদের পরামর্শ নেওয়ার কালচার তৈরি করা।
৪. বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন (প্রতিবন্ধী) নাগরিকদের আত্মকর্মসংস্থান
সমাজের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ও শারীরিক প্রতিবন্ধীদের কেবল করুণার পাত্র না বানিয়ে তাদের উপযোগী প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন।
- সহজ শর্তে ঋণ ও কারিগরি শিক্ষা: বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষদের উপযুক্ত আইটি বা হস্তশিল্পের দক্ষতা দিয়ে স্বাবলম্বী করা।
- সহায়ক সামগ্রী বিতরণ: হুইলচেয়ার, শুনবার যন্ত্র এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম নিয়মিত বিনামূল্যে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা।
উপসংহার
আমাদের প্রবীণদের অভিজ্ঞতা ও আশীর্বাদই আমাদের পথচলার মূল প্রেরণা। তাঁদের শেষ বয়সটা যেন হাসি-খুশি, সম্মান ও নিশ্চিন্তে কাটে—তা নিশ্চিত করা প্রতিটি সচেতন নাগরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের নৈতিক দায়িত্ব।
আসুন, আমরা আমাদের প্রবীণদের মুখে হাসি ফুটাই এবং একটি মানবিক ও সহানুভূতিশীল সমাজ গঠন করি।



